দেখা হবে বন্ধু

গতকাল কুয়েট লাইফের শেষ সেন্ট্রাল ভাইভা হয়ে গেল। আস্তে আস্তে সবই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এবার প্রস্তুতি ছিল সবচেয়ে খারাপ কিন্তু মনের ভেতর কোনো টেনশন কাজ করছিল না। আর ভাইভা বোর্ডেও ছিল সব বাঘা বাঘা স্যার। অনেক কেই রিপিট দিয়েছেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারা সত্ত্বেও আমি রিপিট পেলাম না।

গত ৭ তারিখে ছিল ০৮ এর র‍্যাগ। এবার সেন্ট্রালী র‍্যাগের আয়োজন করা হয়েছিল। তাই পুরো ক্যাম্পাস ছিল উৎসবমুখর। সকাল (আসলে আগের রাত) থেকেই ভুভুজেলার শব্দে মেতে ছিল প্রতিটি হল। আর বিকেলে রঙে রঙে রাঙ্গিয়ে উঠেছিল সবার মন। এর আগে দুপুরে ট্রাকে করে ঘুরে আসলাম খুলনা শহর থেকে। প্রতিটি মুহুর্ত যেন স্বপ্নের মত কেটে গেল।

দিনশেষে গায়ের রঙ তুলতে গিয়ে সে এক বিরাট কান্ড-কারখানা। কেউ কেউ সার্ফ এক্সেল দিয়ে পুরো শরীর সাফ করল। তবে বেশীর ভাগই কেবল রঙ বিহীন মুখমণ্ডল নিয়েই খুশি থাকল। এই লেখা যখন লিখছি তখনো আমার হাত, পা আর পিঠে রঙ লেগে আছে।

তবুও দিন শেষে কেমন যেন ফাঁকাফাঁকা লাগছিল নিজেকে। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে এই কথা মনে হলেই বুকটা মোচর দিয়ে উঠছে।

সন্ধ্যায় কালচারাল প্রোগ্রাম হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ক্লান্তির কারণে একদিন পিছিয়ে দেয়া হল।

যা হোক পরের দিন, কালচারাল প্রোগ্রাম শুরু হতে হতে নয়টা বেজে গেল। ম্যাড়ম্যাড়ে ভাবে শুরু হলেও একটু পরেই জমে উঠল আর উঠতেই থাকল। টকিং টমের সাথে শোভন কায়সারের অভিনয় ছিল সুপার ডুপার হিট। আর সং ফর অ্যানি ওয়ান এর স্লাইড ছিল পুরাই অস্থির। ১২ টায় যখন অনুষ্ঠান শেষ হল, তখন পুরো অডিতে একটাই আওয়াজ  2k8 Rocks!!!!!!!!

আবারো ভোজ

এবার আন্তঃহল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ডঃ এম, এ, রশীদ হল। আর কুয়েটে চ্যাম্পিয়ন মানেই আনলিমিটেড (আসলে লিমিটেড) গরু। গতকাল দেখলাম ৳৪০,০০০ দিয়ে একটা গরু নিয়ে আসা হয়েছে। আজ রাতে হবে ভোজন পর্ব। হিন্দুদের জন্য খাসি (আসলে মেয়ে ছাগল)।

ফাইনাল খেলা ছিল অমর একুশে হলের সাথে। খেলার শুরুতে রশীদ হলের অবস্থা ছিল করুণ। কিন্তু শুভ (সিএসই০৮) নেমে যে ৬ পিটানো শুরু করল তাতেই খেলা পাল্টে গেল। এরপর জায়েদ (সিই০৯) তো ৬ পিটানোর উৎসব করে ফেলল। আর বোলিং করতে নেমে প্রথম ওভারেই নিল ৩ উইকেট। ম্যান অব দ্যা ম্যাচ তখনই নিশ্চিত। বাকি ছিল শুধু শেষ ওভারের মজা। শেষ ওভারে যখন দেখা গেল একুশে হল আর পারবে না, তখন ক্যাপ্টেন তারেক (ইইই০৮) ৯ টা স্লিপ দিয়ে একুশে হল’কে চরম নাস্তানাবুদ করল। এই একুশে হলের পোলাপানই গ্রুপ পর্বে আমাদের সাথে জেতার পর বেশ খারাপ আচরণ করেছিল। মধুর প্রতিশোধ।

কাল আবার মাসিক ফিস্ট। নাহ, ওজনটা আর কমানো গেল না। 😀

আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ

গতকাল কুয়েট লাইফের শেষ ক্লাস হয়ে গেল। সালাউদ্দিন স্যারের সুইসগিয়ার ক্লাস। স্যার তেমন কিছু পড়ালেন না।

বুকের ভেতর কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। আগে এই ক্লাস থেকে বের হওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। একটু পর পর ঘড়ি দেখতাম। ক্লাস শুরুর দশ মিনিট পরেই “স্যার আজ থাক, আজ থাক”, “স্যার, নাস্তা করি নাই” বলে কোরাস তুলতাম।  কিন্তু আজ হঠাৎ করেই মনে পড়ল আর কখনোই এসব করা হবে না।

কখনোই শোনা হবে না শোভন কায়সারের ব্যতিক্রমধর্মী “ইয়েস স্যার, প্রেজেন্ট স্যার, উপস্থিত স্যার” আর ক্লাসের মাঝে দেলোয়ারের সলো কন্ঠের “জ্বি স্যার”। ডঃ রফিকুল ইসলাম স্যার আর কখনোই জাপানের গল্প করবেন না, বলবেন না তার সুপারভাইজারের “নান্দে (কেন?)” শব্দটির তাৎপর্য। কোন ক্লাস টেস্টের তারিখ ঠিক হলেই অরিন তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করবে না। করা হবে না, শোনা হবে না, দেখা হবে না আরো কতকিছু।

বিকেলে ক্লাস পার্টি ছিল। EEE ক্লাস পার্টি মানেই Something Awesome. আজও তার ব্যতিক্রম ছিল না। আমাদের ব্যাচে অনেকগুলো গ্রুপ আছে, অনেকের সাথে অনেকের পারসোনাল দ্বন্দ্ব আছে। কিন্তু ব্যাচের ব্যাপারে সবাই এক। এই একটা বস্তুই EEE2K8 কে অন্য সব ব্যাচ থেকে আলাদা করেছে বলে মনে হয়।

এখন বুঝি দারুণ সময়

আজ কুয়েট লাইফের শেষ ক্লাস টেস্ট(হাই-ভোল্টেজ) দিয়ে আসলাম। বাকি থাকল দুটি ল্যাব কুইজ আর সেন্ট্রাল ভাইভা। কাল সুইস-গিয়ার কুইজ ও ভাইভা। গত ফেব্রুয়ারী থেকে হরতালের উৎসব চলছে। আজও যথারীতি হরতাল ছিল। তবে হরতালেও আমাদের ক্লাস চলছে। আর কয়েকদিন ক্লাস। তারপর ছাত্রজীবন মোটামুটি শেষ।

শেষের দিনগুলোতে এসে বেশ নস্টালজিক লাগছে।

কত তাড়াতাড়ি ৪ টি বছর শেষ হয়ে গেল। মনে পড়ে এইতো ১ মার্চ ২০০৯ আমাদের ওরিয়েন্টেশন হল। কত আশা, কত স্বপ্ন নিয়ে কুয়েটে এসেছিলাম। প্রথম দিকে বড় ভাইদের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকতাম। প্রথম দিন ডাইনিং এ গিয়েই এক বড় ভাইয়ের ঝাড়ি খেয়েছিলাম। ভয়ে তার মুখের দিকে ভালভাবে তাকাতে পারিনি। টিটিরুমে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ব্যাটের নাগাল পেতাম না। পেপারের কোনো পাতাই ঠিকমত পড়তে পারতাম না। বাধ্য হয়ে Daily Star পড়তাম। খেলার ফাঁকে ফাঁকে 9XM দিলেও মনের রাগ মনেই পুষে রাখতাম। তবে ভাল লাগত সেই কালচারাল প্রোগ্রামগুলো, নানা সংগঠন থেকে ওরিয়েন্টেশন আর কুয়েট ফিল্ম সোসাইটির মুভিগুলো।

এখন দিনকাল একদমই আলাদা। এখন রুমের বাইরে বের হলেই ২কে১২ এর সালাম । কেউ আর 9XM দেখে না। টিটিরুমে অনেকদিন ঢোকা হয় না। পত্রিকা সব অনলাইনেই পড়া হয়। কুয়েট কালচারার প্রোগ্রাম যে কি জিনিশ অনেক জুনিয়র তা জানেই না।

না আর এভাবে ভাবতে ইচ্ছা করছে না। এখনো মাস দুয়েক আছে ক্লিয়ারেন্স পর্যন্ত, এখনো কুয়েটেই আছি।