দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইল না

স্কুল জীবনের দুটি ঘটনা সেদিন কেন জানি মনে পড়ল…

ঘটনা ১।

যখন সেভেনে পড়ি, তখন ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। আমার কাজ ছিল কে ক্লাসে হইচই করল, কে ক্লাস পালাল তার লিস্ট করে রাখা। তো হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম, একটা ছেলে প্রতিদিন ২য় ঘন্টার পর ক্লাস থেকে পালায়। স্যারেরও নজরে আসল ঘটনাটা। তো স্যার বললেন, আগামীদিন ওর পাশে বসবি আর পালাতে গেলেই ধরে ফেলবি। আমরা কেউ কিছু জানতাম না ওর সম্পর্কে, তবে এক ক্লাস চোরকে ধরার সে এক অদ্ভুত শিহরণ সবার মাঝে। পরেরদিন যথারীতি ওর পাশে গিয়ে বসলাম আর বেচারা দুই ক্লাস করে যেই না পালাতে যাবে আর আমরা খপ করে পাকড়াও করলাম। একটু পর স্যার এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলেন, কিরে প্রতিদিন ২ ক্লাস করে পালাস কেন? পড়াশোনা করতে ভাল না লাগলে মাঠে গিয়ে হালচাষ কর! উত্তরে ছেলেটি যা বলল তাতে সবার মাথা লজ্জায় নুয়ে গেল।

না, পালিয়ে সে খেলাধুলা করে না, বাজারে ঘোরাঘুরিও করে না, এমনকি বাড়িতেও যায় না। সে যায় চুল কাটতে। তা দিয়ে যা রোজগার হয় তাতেই তার সংসার চলে। পড়াশোনা করার অনেক ইচ্ছা তার, কিন্তু আর সময় কই। পুরো ইস্কুল করলে সে খাবে কি, তার বাড়ির লোকজন কি খাবে।

সেদিন লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। তারপর স্যারদের সহযোগিতায় তার স্কুলের সকল বেতনাদি মাফ করে দেয়া হয়। এইট পর্যন্ত তার সাথে যোগাযোগ ছিল। জানি না এখন সে কোথায়, নামটাও মনে নেই। সম্ভবত আরিফ!

ঘটনা ২।

আমাদের স্কুল তেমন কোন আহামরি কিছু ছিল না। তারপরও অন্যরকম আনন্দ ছিল। যেমন, ক্লাস সেভেনে মোকাদ্দেস স্যার যখন বীজগণিত শেষ করে সিংগারা পার্টির আয়োজন করেছিলেন। সবার কাছে থেকে দুই টাকা করে তোলা হল, সেই টাকা দিয়ে জলযোগ হোটেল থেকে সিংগারা নিয়ে আসা হল। সবাইকে বিতরণ করা হল। সবার হাতে সিঙ্গারা, কি অপূর্ব স্বাদ ছিল সেই সিঙ্গারার। কি নির্মল আনন্দ।

Advertisements

গুরু তোমায় সালাম

এখন পর্যন্ত আমার জীবনের স্বর্ণযুগ বলতে ক্লাস টেন’ই বুঝি। কত আনন্দ, কত খেলাধুলা, কত ঘটনা আর কত পড়াশোনা। তখন সবার মাঝে সে কি উৎসাহ, আর বছর খানেক পড়েই এস,এস,সি পরীক্ষা। সিরিয়াসনেস-এর কোন ঘাটতি নেই।

ঠিক সেসময়ই রুহুল আমিন নামে এক ইংরেজি শিক্ষক এর নাম শুনি। তিনি নাকি আবার সাউন্ড সিস্টেম ইউজ করেন। সিনিয়ররা বলছেন উনিই বস। তো ২০০৫ এর ১লা জানুয়ারী থেকে শুরু করলাম তার কাছে ইংরেজি পড়া। তার পড়ানো ছিল অদ্ভুত। অসম্ভব গালিগালাজ আর অপমান করতেন। আর কথায় কথায় হাসাতেন। আমাদের দুই বন্ধু আরিফ আর মাসুম। এই দুইজনের জন্য স্যারের গালি ভান্ডার ছিল ভরপুর। তারপরও স্যারকে অসম্ভব ভাল লাগতো। ইংরেজিকে ভাল লাগা শুরু করলাম। স্যার যখন যে বই এর নাম বলতেন, সেই বই খুঁজে বের করে পড়ার চেষ্টা করতাম। স্যারের সাথে আরও দুইজন সাগরেদ ছিল। একজন প্রিয় আরিফ ভাই আর একজন পারভেজ ভাই। এই দুইজনের কাজ ছিল খাতা দেখা। পারভেজ ভাই খাতা দেখা মানে লাল আর লাল। ইংরেজি ওনার জীবন। একটা মানুষ ইংরেজি নিয়ে এতটা পাগল কিভাবে হয় জানিনা। উনি বেছে বেছে আমার খাতা দেখতেন আর আমার খাতা লাল হয়ে যেত। তারপরও উনি আমাকে পছন্দ করতেন, নানা টিপস দিতেন আর সবসময় ইংরেজিতে কথা বলতেন। সেই সময়ে ইংরেজির জন্য যে পরিশ্রম করেছি, আজ পর্যন্ত তা ছাড়িয়ে যেতে পারিনি। বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে স্যার আমাদের কয়েকজনকে দুবেলা পড়াতেন। এত আনন্দ নিয়ে আর কোনদিন পড়াশোনা করিনি। দেখতে দেখতে সময় চলে গেল। বিদায়ের দিন সুন্দর একটা অনুষ্ঠান হল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যার একটা গান গাইলেন।

আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি,

আর মুগ্ধ হয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি ।

বাজে কিনি কিনি রিনি ঝিনি

তোমারে যে চিনি চিনি,

মনে মনে কত ছবি এঁকেছি।।

এস, এস, সি তে এ+ পেলাম। সবগুলো বিষয়ে পেয়েছি কিনা তা নিয়ে স্যারের টেনশনের শেষ নেই। দিনকয়েক পর স্যারের কাছ থেকেই জানলাম, সবগুলো বিষয়ে এ+ পেয়েছি। স্যার নিজে এস,এস, কম্পিউটার্সে বসে আমার রেজাল্ট জেনেছেন। তাও আমার আগে।

পরীক্ষার পর স্যারের খেয়াল হল আমাদের স্পোকেন ইংলিশ শেখাবেন। আমরাও এক পায়ে খাড়া। কয়েকজন মিলে শুরু করলাম বটে কিন্তু বেশি দূর এগোল না। এরপর ঢাকায় কলেজে ভর্তি হলাম। ছুটি হলেই বাসায় এসে প্রথম কাজ ছিল স্যারের কাছে যাওয়া। ঘন্টার পর ঘন্টা স্যারের সাথে ইংরেজি নিয় আলাপ করা। ইন্টারে পড়ার সময় স্যারের ওখানে একবার রি-ইউনিয়নও করেছিলাম। লেলিনসহ কয়েকজন দাওয়ার পায়নি বলে রাগও করেছিল।

ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে স্যারের কাছে যাওয়া একদম কমে গেল। প্রথম প্রথম তাও যাওয়া হত। পরের দিকে একদম বাদ হয়ে গেল। জানিনা কেন এমন হল। শেষবার মিঠু ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

এই ঈদে পারভেজ ভাইয়ের সাথে দেখা। কথায় কথায় বললেন, স্যারের কোন খবর জানি কি না। বললাম, না। বললেন, স্যারের সময় ভাল যাচ্ছে না। পারিবারিক নানা ঝামেলায় পড়েছেন। আমাদের উচিত স্যারের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করা। নিজের প্রতি রাগ হল। সত্যিই, আমি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাচ্ছি। মনে মনে ঠিক করলাম, খুব শীঘ্রই স্যারের সাথে দেখা করব।

ঈদের ছুটি শেষে চন্দ্রায় চলে আসলাম।

আজ বিকেলে মাসুম ফোন করে জানাল, স্যারের সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না। স্যার আর আমাদের মাঝে নেই।