গুরু তোমায় সালাম

এখন পর্যন্ত আমার জীবনের স্বর্ণযুগ বলতে ক্লাস টেন’ই বুঝি। কত আনন্দ, কত খেলাধুলা, কত ঘটনা আর কত পড়াশোনা। তখন সবার মাঝে সে কি উৎসাহ, আর বছর খানেক পড়েই এস,এস,সি পরীক্ষা। সিরিয়াসনেস-এর কোন ঘাটতি নেই।

ঠিক সেসময়ই রুহুল আমিন নামে এক ইংরেজি শিক্ষক এর নাম শুনি। তিনি নাকি আবার সাউন্ড সিস্টেম ইউজ করেন। সিনিয়ররা বলছেন উনিই বস। তো ২০০৫ এর ১লা জানুয়ারী থেকে শুরু করলাম তার কাছে ইংরেজি পড়া। তার পড়ানো ছিল অদ্ভুত। অসম্ভব গালিগালাজ আর অপমান করতেন। আর কথায় কথায় হাসাতেন। আমাদের দুই বন্ধু আরিফ আর মাসুম। এই দুইজনের জন্য স্যারের গালি ভান্ডার ছিল ভরপুর। তারপরও স্যারকে অসম্ভব ভাল লাগতো। ইংরেজিকে ভাল লাগা শুরু করলাম। স্যার যখন যে বই এর নাম বলতেন, সেই বই খুঁজে বের করে পড়ার চেষ্টা করতাম। স্যারের সাথে আরও দুইজন সাগরেদ ছিল। একজন প্রিয় আরিফ ভাই আর একজন পারভেজ ভাই। এই দুইজনের কাজ ছিল খাতা দেখা। পারভেজ ভাই খাতা দেখা মানে লাল আর লাল। ইংরেজি ওনার জীবন। একটা মানুষ ইংরেজি নিয়ে এতটা পাগল কিভাবে হয় জানিনা। উনি বেছে বেছে আমার খাতা দেখতেন আর আমার খাতা লাল হয়ে যেত। তারপরও উনি আমাকে পছন্দ করতেন, নানা টিপস দিতেন আর সবসময় ইংরেজিতে কথা বলতেন। সেই সময়ে ইংরেজির জন্য যে পরিশ্রম করেছি, আজ পর্যন্ত তা ছাড়িয়ে যেতে পারিনি। বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে স্যার আমাদের কয়েকজনকে দুবেলা পড়াতেন। এত আনন্দ নিয়ে আর কোনদিন পড়াশোনা করিনি। দেখতে দেখতে সময় চলে গেল। বিদায়ের দিন সুন্দর একটা অনুষ্ঠান হল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে স্যার একটা গান গাইলেন।

আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি,

আর মুগ্ধ হয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি ।

বাজে কিনি কিনি রিনি ঝিনি

তোমারে যে চিনি চিনি,

মনে মনে কত ছবি এঁকেছি।।

এস, এস, সি তে এ+ পেলাম। সবগুলো বিষয়ে পেয়েছি কিনা তা নিয়ে স্যারের টেনশনের শেষ নেই। দিনকয়েক পর স্যারের কাছ থেকেই জানলাম, সবগুলো বিষয়ে এ+ পেয়েছি। স্যার নিজে এস,এস, কম্পিউটার্সে বসে আমার রেজাল্ট জেনেছেন। তাও আমার আগে।

পরীক্ষার পর স্যারের খেয়াল হল আমাদের স্পোকেন ইংলিশ শেখাবেন। আমরাও এক পায়ে খাড়া। কয়েকজন মিলে শুরু করলাম বটে কিন্তু বেশি দূর এগোল না। এরপর ঢাকায় কলেজে ভর্তি হলাম। ছুটি হলেই বাসায় এসে প্রথম কাজ ছিল স্যারের কাছে যাওয়া। ঘন্টার পর ঘন্টা স্যারের সাথে ইংরেজি নিয় আলাপ করা। ইন্টারে পড়ার সময় স্যারের ওখানে একবার রি-ইউনিয়নও করেছিলাম। লেলিনসহ কয়েকজন দাওয়ার পায়নি বলে রাগও করেছিল।

ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে স্যারের কাছে যাওয়া একদম কমে গেল। প্রথম প্রথম তাও যাওয়া হত। পরের দিকে একদম বাদ হয়ে গেল। জানিনা কেন এমন হল। শেষবার মিঠু ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

এই ঈদে পারভেজ ভাইয়ের সাথে দেখা। কথায় কথায় বললেন, স্যারের কোন খবর জানি কি না। বললাম, না। বললেন, স্যারের সময় ভাল যাচ্ছে না। পারিবারিক নানা ঝামেলায় পড়েছেন। আমাদের উচিত স্যারের সাথে মাঝে মাঝে দেখা করা। নিজের প্রতি রাগ হল। সত্যিই, আমি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাচ্ছি। মনে মনে ঠিক করলাম, খুব শীঘ্রই স্যারের সাথে দেখা করব।

ঈদের ছুটি শেষে চন্দ্রায় চলে আসলাম।

আজ বিকেলে মাসুম ফোন করে জানাল, স্যারের সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না। স্যার আর আমাদের মাঝে নেই।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s