দাদা দিদির কথা ও তাম্বুলপুর

গত ২৪ জুন রাতে বড়মাসি মারা গেছেন। পরদিন সকালে মা ফোন করে জানাল। বড়ই ভেঙ্গে পড়েছেন।

বড়মাসিদের সাথে আমাদের বিশেষ করে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম। কেননা আমার অনেকটা শৈশব কেটেছে মাসতুতো ভাই বোনদের সাথে।

১৯৯৬ সালে লতা ও ঊষা দিদির এস,এস,সি পরীক্ষা। বড় মেসো তখন রাজাবিরাট এর তহশিলদার। তিনি নিজের কাছে রেখে মেয়েদের পড়াতেন। তাদের পরীক্ষার সিট পড়ে মফঃস্বলে। সেখানে আমাদের জমি কেনা ছিল আর তাতে দুটো টিনের ঘর। তো সেখানেই তারা উঠলেন। আমাকেও গ্রামের বাড়ি থেকে পাঠানো হল।
তাদের পরীক্ষার সময়টা বসেই ছিলাম। তারপর হঠাৎ করেই একদিন কেজি স্কুলে নিয়ে ভর্তি করানো হল।

সেই থেকেই শুরু। দিদিরা পাস করল। কলেজে ভর্তি হল। শিল্পী দিদিও এসে কিছুদিন থাকল। শিখা দিদি ও উৎপল দাদা এল। তারা এস,এস,সি পাস করল। কলেজে ভর্তি হল।

মাঝে আমরা বাড়ি করলাম। তখন সবাই পাশের বাসায় ভাড়া থাকতাম।

সেই সূত্রেই মাসীদের বাড়িতে যাওয়া হত বেশী।

সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে ঊষা দিদির বিয়ের কথা। তখন আমি বোধহয় থ্রি তে পড়ি। খুব আনন্দ হয়েছিল সেবার। আমার মায়েরা ৬ বোন, এক ভাই। তাই মাসতুতো আর মামাত ভাইবোন মিলে আমরা অনেক। সেবার বোধহয় বেশির ভাগ ভাইবোন এসেছিল।

আরেকবার গিয়েছিলাম স্বরসতী পূজার সময়। সেবারও অনেক মজা হয়েছিল। ওখানকার স্থানীয় ছেলেদের সাথে অনেক মিল হয়ে গিয়েছিল। সবাই মিলে ক্রিকেট খেলতাম।

শেষবার গেলাম প্রদীপ দাদার বিয়েতে। তখন ক্লাস এইটে পড়ি।

আপামণি লবণটা যেন কি

আগে এখনকার মত আয়োডিন লবনের প্রচলন ছিল না। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই খোলা লবন ব্যাবহার করত। আমাদের গ্রামে ভ্যানে করে নিয়ে আসত লবন। ভ্যানের সামনে থাকত একটা মাইক। তাতে ঘোষণা দিত, “এই লবন বদল”। মানে হল, বিভিন্ন পুরানো জিনিসপত্রের পরিবর্তে লবন বদল করে নেয়া।

[তখন বিটিভিতে আয়োডিনযুক্ত লবনের অভাবে কি কি রোগ হয়, তা নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হত। এর মাঝে একটি রোগ ছিল ঘ্যাগ। আমাদের পাশের বাড়িতে মনোরঞ্জনের ঠাকুরমা থাকত। তার ঘ্যাগ থাকায় অনেকে তাকে ঘ্যাগী বুড়ি বলে ডাকত। আবার গুরুজনেরা বলত বোতলে জল খেলেও এরকম ঘ্যাগ হয়। তাই আমরা ভয়ে আয়োডিনযুক্ত লবন খেতাম আর বোতলে জল খাওয়া থেকে বিরত ছিলাম।

তখন মোল্লা সল্টের খুব নাম ডাক।

“তেজ পাতা, চিনি,
বাইছা বাইছা কিনি,
কেনে প্রতিজন
মোল্লা লবণ।।”]

এরকম আরো ছিল। মাঝে মাঝে কটকটিওয়ালা আসত। এই কটকটি অবশ্য মহাস্থানগড়ের কটকটি নয়। তারা নিত লোহার জিনিসপত্র।

আইস্ক্রিমওয়ালা ছিল দুই রকমের। একদল ছিল কাঠের বাক্স নিয়ে ঘুরত সাইকেলের পিছনে। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে কাঠের বাক্সের ঢাকনা খুলে জোরে আওয়াজ করে বন্ধ করত। তাতেই বাড়ির যত ছেলে-মেয়ে ছুটে আসত আলু বা ধান নিয়ে। টাকা দিয়ে বেচা-কেনা খুব একটা হত না। আর টাকা ছিলই বা কার কাছে! আর এক ধরনের আইস্ক্রিমওয়াল আসত ভ্যান নিয়ে ঘন্টা বাজাতে বাজাতে। তবে গ্রামের দিকে তাদের দেখা পাওয়া যেত না।

রান্নার হাঁড়িপাতিল নিয়ে আসত আরেক দল ফেরিওয়ালা। তাদের বিনিময় ছিল পুরানো কাপড়।

আর ছিল মেয়েদের বিভিন্ন সাজগোজের ফেরিওয়ালা। তাদের ছিল সুন্দর চারকোনা কাঠের বাক্স। সামনের দিকটা কাঁচের। তাতে সুন্দরভাবে সস্তা দুল, নোলক, গলার চেইন সাজানো থাকত। সবচেয়ে প্রচলিত ছিল তিব্বত স্নো আর শীতকালে পমেড।