গ্রামের দিনগুলি

তখন আমি গ্রামে ছিলাম। বয়স কত মনে নেই। ৩-৪ হতে পারে। আমাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য রবিন নামে একজনকে মাসির বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। তার সাথে একদিন দহপাড়া মাছ ধরতে যাই। গিয়ে দেখি অনেক লোক মাছ ধরছে। অনেকটা বিলের মত। আমার হাতে একটা বড় মাছ এসেছিল। ধরতে পারি নি। বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। তারপরও পরে মনে হয় আর যাওয়া হয়নি।

স্কুলের দিকে যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ি থেকে, মাঝে একটা ছোট কাল্ভার্ট পড়ে। আমরা বলতাম পুল। পুলের নিচে ডোবার মত কিছুটা জল ছিল। একদিন কাকা, স্বপন, মনোরঞ্জনের সাথে গেলাম সেখানে স্নান করতে। আমার মা জানলে রাগ করবে তাই ওরা আমাকে প্রথমে নিতে চায় নি। পরে সল্টেজ বিস্কুট ঘুষ দিতে হয়েছিল। সারা দুপুর জলে ঝাপাঝাপি করে রোদে গা-মাথা শুকিয়ে নিশ্চিন্ত মনে যখন বাড়ি ফিরলাম, আমার লাল চোখ দেখে মা বুঝে গেলেন কি করেছি সারাদিন। আবার কলের পাড়ে নিয়ে গেলেন গা ধুতে।

একদিন সকালে আমি আর মনোরঞ্জন সেই স্কুলে যাওয়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সেই পুলের কাছে এসে থামলাম। দুজনে ফন্দি করলাম, রড় হয়ে একটা ট্রাক কিনব । আমি হবো ড্রাইভার, আর ও হেল্পার। অথবা একটা টেম্পু কিনব।

মাঝে মাঝে আমরা ফুরকুনি (বনভোজন) করতাম ছোটরা মিলে। আমাদের সমবয়সী ছিল চপলা। রান্নার দায়িত্ব ছিল তার। নামায় (ধানক্ষেতে) চুলা তৈরি করতাম। সবাই একটু করে চাল, ডাল, আলু, পত্তে, পিয়েজ, বেগুন, নুন, তেল নিয়ে আসত। হলুদের কথা মনে থাকত না। বেগুন ভাঁজি হত কালো। একবার নামায় কাঁকড়া পেয়েছিলাম। সেটাই ভেঁজে খাওয়া হল। বড়দের সাথে একবার পুষনা করেছিলাম। শীতের ভিতর। মাইক ভাড়া করে আনা হয়েছিল।

গরু দিয়ে হালের পর বড় বড় মাটির ঢেলা হত। সেগুলোকে আবার ঢেল ভাঙ্গা দিয়ে ভাংতে হত। বাবু আমার জন্য একটা ছোট ঢেল ভাঙ্গা বানিয়ে দিয়েছিল। নিজের জিনিসের অনুভূতি অন্যরকম। স্যালাইনের ব্যাগ, পাইপ আর সিরিঞ্জ দিয়ে শ্যালো মেশিন বানাতাম আর স্বপ্ন দেখতাম আমার একটা ছোট মেশিন থাকবে।

কিছুদিন পর পেলাম ফুটবল। গ্রামে আমরা বলতাম বল খেলা। একটা খেলা ছিল ফাটাফাটি খেলা। বলে শট দিয়ে অন্যকে মারতে হবে। স্বপন ছিল সব থেকে পাকা। একদিন অনেক সাহস নিয়ে ওর সাথে ফাটাফাটি খেললাম।

আমাদের বাড়িতে টিভি আসার পর পুরো গ্রামের লোকজন শুক্রবারে জমা হত ছবি দেখার জন্য। আমি দুঃখের অংশ দেখতে পারতাম না। কর্তার কোলে করে ঘুরতাম। আমার আবদার রাখতে গিয়ে তার দেখা হত না। রাতে হত আলিফ লায়লা। অর্ধেক হতে ব্যাটারী শেষ হয়ে আসত। ধীরে ধীরে পর্দা ছোট হয়ে আসত। একদিন নাটকে গান হল, “আজ পাশা খেলব রে শ্যাম”। পরদিন কর্তা সারাদিন গাইলেন সে গান। আর একদিন নাটকে কে যেন কাঁদছিল। কর্তা ছুটে এলেন আমাদের ঘরে। খোঁজ নিলেন মা কাঁদছেন কি না। কতদিন আমি আর কাকারা গবেষণা করেছি টিভি বন্ধ হলে ছোট মানুষ গুলো কই যায়। নায়িকারা এত তাড়াতাড়ি অন্য শাড়ি পড়ে কিভাবে।

বাড়ির খুলিতেই শ্যালো মেশিন। সকালে দাঁতন খুজে দাঁত মেজে মেশিনের ড্রেনে মুখ ধুতাম। দুপুরে গা ধুতাম মেশিনের জলে। গা আঠালো হয়ে যেত। মা আবার নিয়ে যেতেন কলের পাড়ে।

Advertisements