ইয়াক ইয়াক

আজ বড় অলস সময় কাটছে। হাতে যে কাজ নেই তা নয়। কিন্তু স্থান, কাল ও পাত্রভেদে সব কাজ করতে হয় বলে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা পড়ছিলাম। প্রথমবার পড়েছিলাম ক্লাস নাইনে থাকতে। অভিজিতের সুন্দর বইখানি ধার করে এনেছিলাম। আমার কাছ থেকে নিয়েছিল শাওন। তারপর তা আর মালিকের কাছে ফিরেছে কিনা কে জানে ।

কিন্ডল কেনার পর থেকেই নতুন উদ্যমে বই পড়া শুরু করলাম। প্রথমে অনেকগুলো ইংরেজি বই পড়লাম। কিন্তু বাংলা না পড়লে যে পেটের ভাত হজম হতে চায় না।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর কিছু বাংলা বই পেলাম। সাথে সেই পুরানো টেনিদা। আহ, কি সুমধুর সেই স্মৃতি। এত নির্ভেজাল জীবন আর আনন্দ আর কোথায় পাব।

ইউটিউবে দেখলাম টেনিদা কার্টুনও আছে। দেখলাম কয়েক পর্ব। একবারে খারাপ না। ভয়েস খুব ভাল লেগেছে।

Advertisements

কোন মানবতা নয়

খুশবন্ত সিং এর লেখা “এ ট্রেন টু পাকিস্তান” পড়লাম। বাঙ্গালী হওয়ার কারণে বাংলায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা সম্পর্কে ধারণা ছিল। বেশি কিছু জানা হয়নি কখনো। বাংলার সাথে সাথে যে পাঞ্জাবও দুই ভাগে ভাগ হয়েছে তা জানা ছিল না।

নিজের ভিটে মাটি ত্যাগ করে নতুন করে জীবন শুরু করা অনেক কঠিন। আর তার সাথে মৃত্যুর হাতছানি। শুধু আলাদা ধর্মে জন্মের জন্য কেউ কারও দুশমন হয়ে যায় তা ভাবতেই পারি না। হিংসা আর গুজব যে মানুষের কত বড় ক্ষতি করতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ ভারত-পাকিস্তানের দাঙ্গা।

অতিপ্রাকৃত প্রকৃতি

হয়তো ওই চাঁদ আর এই পৃথিবীর ইতিহাস আছে। কিন্তু যে ধারাবাহিক অন্ধকার মাতৃগর্ভ হইতে সংগ্রহ করিয়া দেহের অভ্যন্তরে লুকাইয়া ভিখু ও পাঁচী পৃথিবীতে আসিয়াছিল এবং যে অন্ধকার তাহারা সন্তানের মাংসল আবেষ্টনীর মধ্যে গোপন রাখিয়া যাইবে তাহা প্রাগৈতিহাসিক, পৃথিবীর আলো আজ পর্যন্ত তাহার নাগাল পায় নাই, কোনোদিন পাইবেও না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়. প্রাগৈতিহাসিক

রিপুকে পরিত্যাগ করে মানুষ বাঁচতে পারে না। পারলেও তাকে বেঁচে থাকা বলে না। জানিনা ঈশ্বর কাউকে কিছু উপহার দিয়ে তা ব্যবহার করতে বারণ করবেন কিনা। আমার মন কেন যেন সায় দেয় না।

আজ পর্যন্ত যারা মনের সাথে জোর করে প্রকৃতির বিপরীতে গেছেন, তারাই জন্ম দিয়েছেন লজ্জার ইতিহাস।

নারিকেল পাতার ঘড়ি

আমাদের গ্রামের বাড়িতে বেশ কিছু নারিকেল গাছ আছে । আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। একবার প্রচন্ড এক তুফানে আমাদের গোয়াল ঘরের চালা উড়ে গিয়ে আটকালো বাড়ির মাঝে এক নারিকেল গাছের মাথায়।

মাঝে মাঝে নারিকেল গাছের পাতা কাটা হত। সেদিন যেন উৎসব এর আমেজ এসে যেত বাড়িতে। সবাই মিলে কাজে লেগে যেত। কেউ পাতাগুলো কান্ড থেকে আলাদা করছে, কেউ কান্ডটা কাটছে ছোট করে, আবার কেউ সেগুলো চিকন শলাকা তৈরী করছে। সেগুলো দিয়ে তৈরী হত ঝাড়ু।

আর আমরা তৈরী করতাম নারকেল পাতার বাঁশি, হাতঘড়ি ও চশমা। বাঁশিগুলো হতো চোঙ্গার মত। মেয়েরা কলার পাতা চিকন করে ছিঁড়ে তৈরী করত চুল। আমের পুরানো কোয়া দিয়েও সুন্দর বাঁশি তৈর করা যেত।

সঙ্কটাপন্ন স্বপ্ন

এক সময় একটা কথা শুনেছিলাম। কার কাছে শুনেছিলাম মনে নেই।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের স্বপ্নগুলো মরে যেতে থাকে।

জানিনা কথাটা কতটুকু ঠিক বা বেঠিক।

বইপড়ায় আলসেমি

একটা বদ অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। একটা বই শেষ না করেই আরেকটা বই শুরু করছি। এভাবে প্রায় ৭-৮ টা বই জমে গেছে। এবার শেষ করতেই হবে। তাই একটা একটা করে আগাচ্ছি।

প্রথমে শুরু করলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা চিলেকোঠার সেপাই দিয়ে। বইটির ৭০ ভাগ পড়ে রেখেছিলাম। ৬৯ এর গনঅভ্যুত্থান এর উপর লেখা। একই সাথে রাজধানী ও গ্রামের আবহ উঠে এসেছে স্বমহিমায়। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার পুরো উপন্যাসকে করেছে জীবন্ত।

চিলেকোঠার সেপাই শেষ করে শুরু করলাম চেতন ভগতের ওয়ান ইন্ডিয়ান গার্ল। অন্যরকম কাহিনী। সমাজ ও পরিবারের কাছে লুকিয়ে ভালবাসার সন্ধান করে ফেরা এক মেয়ের গল্প।

তারপর শুরু করলাম আফগান আমেরিকান লেখন খালেদ হোসেনীর লেখা দ্যা কাইট রানার। ৫১ শতাংশ পড়া ছিল।আমার কাছে নতুন এক জগত। এর আগে আফগানিস্তান নিয়ে লেখা পড়া হয় নি। তাই একটু বেশি আগ্রহ কাজ করছিল। অসাধারণ পটভূমিতে লেখা উপন্যাসে ফুটে উঠেছে আফগানে ক্ষমতার পালাবদল আর তার সাথে মানুষের জীবনের রংবদল। আজ সাময়িকভাবে যা ভাল মনে হয়, তা আগামীতে যে কি বয়ে নিয়ে আসবে তার কোন ঠিক নেই। অবশেষে গতকাল সন্ধ্যায় শেষ দিলাম।

আরো বেশ কয়েকটি তালিকায় আছে।

১। পঞ্চতন্ত্র – সৈয়দ মুজতবা আলী

২। দিবারাত্রির কাব্য – মানিক বন্দোপাধ্যায়

৩। হ্যারি পটার এন্ড দ্যা সর্সারার্স স্টোন – জে কে রাউলিং

৪। দ্যা উইংস অফ ফায়ার – এপিজে আবুল কালাম আজাদ

৫। ছোট গল্পসমগ্র – তলস্তয়

গ্রামের দিনগুলি

তখন আমি গ্রামে ছিলাম। বয়স কত মনে নেই। ৩-৪ হতে পারে। আমাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য রবিন নামে একজনকে মাসির বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। তার সাথে একদিন দহপাড়া মাছ ধরতে যাই। গিয়ে দেখি অনেক লোক মাছ ধরছে। অনেকটা বিলের মত। আমার হাতে একটা বড় মাছ এসেছিল। ধরতে পারি নি। বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। তারপরও পরে মনে হয় আর যাওয়া হয়নি।

স্কুলের দিকে যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ি থেকে, মাঝে একটা ছোট কাল্ভার্ট পড়ে। আমরা বলতাম পুল। পুলের নিচে ডোবার মত কিছুটা জল ছিল। একদিন কাকা, স্বপন, মনোরঞ্জনের সাথে গেলাম সেখানে স্নান করতে। আমার মা জানলে রাগ করবে তাই ওরা আমাকে প্রথমে নিতে চায় নি। পরে সল্টেজ বিস্কুট ঘুষ দিতে হয়েছিল। সারা দুপুর জলে ঝাপাঝাপি করে রোদে গা-মাথা শুকিয়ে নিশ্চিন্ত মনে যখন বাড়ি ফিরলাম, আমার লাল চোখ দেখে মা বুঝে গেলেন কি করেছি সারাদিন। আবার কলের পাড়ে নিয়ে গেলেন গা ধুতে।

একদিন সকালে আমি আর মনোরঞ্জন সেই স্কুলে যাওয়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সেই পুলের কাছে এসে থামলাম। দুজনে ফন্দি করলাম, রড় হয়ে একটা ট্রাক কিনব । আমি হবো ড্রাইভার, আর ও হেল্পার। অথবা একটা টেম্পু কিনব।

মাঝে মাঝে আমরা ফুরকুনি (বনভোজন) করতাম ছোটরা মিলে। আমাদের সমবয়সী ছিল চপলা। রান্নার দায়িত্ব ছিল তার। নামায় (ধানক্ষেতে) চুলা তৈরি করতাম। সবাই একটু করে চাল, ডাল, আলু, পত্তে, পিয়েজ, বেগুন, নুন, তেল নিয়ে আসত। হলুদের কথা মনে থাকত না। বেগুন ভাঁজি হত কালো। একবার নামায় কাঁকড়া পেয়েছিলাম। সেটাই ভেঁজে খাওয়া হল। বড়দের সাথে একবার পুষনা করেছিলাম। শীতের ভিতর। মাইক ভাড়া করে আনা হয়েছিল।

গরু দিয়ে হালের পর বড় বড় মাটির ঢেলা হত। সেগুলোকে আবার ঢেল ভাঙ্গা দিয়ে ভাংতে হত। বাবু আমার জন্য একটা ছোট ঢেল ভাঙ্গা বানিয়ে দিয়েছিল। নিজের জিনিসের অনুভূতি অন্যরকম। স্যালাইনের ব্যাগ, পাইপ আর সিরিঞ্জ দিয়ে শ্যালো মেশিন বানাতাম আর স্বপ্ন দেখতাম আমার একটা ছোট মেশিন থাকবে।

কিছুদিন পর পেলাম ফুটবল। গ্রামে আমরা বলতাম বল খেলা। একটা খেলা ছিল ফাটাফাটি খেলা। বলে শট দিয়ে অন্যকে মারতে হবে। স্বপন ছিল সব থেকে পাকা। একদিন অনেক সাহস নিয়ে ওর সাথে ফাটাফাটি খেললাম।

আমাদের বাড়িতে টিভি আসার পর পুরো গ্রামের লোকজন শুক্রবারে জমা হত ছবি দেখার জন্য। আমি দুঃখের অংশ দেখতে পারতাম না। কর্তার কোলে করে ঘুরতাম। আমার আবদার রাখতে গিয়ে তার দেখা হত না। রাতে হত আলিফ লায়লা। অর্ধেক হতে ব্যাটারী শেষ হয়ে আসত। ধীরে ধীরে পর্দা ছোট হয়ে আসত। একদিন নাটকে গান হল, “আজ পাশা খেলব রে শ্যাম”। পরদিন কর্তা সারাদিন গাইলেন সে গান। আর একদিন নাটকে কে যেন কাঁদছিল। কর্তা ছুটে এলেন আমাদের ঘরে। খোঁজ নিলেন মা কাঁদছেন কি না। কতদিন আমি আর কাকারা গবেষণা করেছি টিভি বন্ধ হলে ছোট মানুষ গুলো কই যায়। নায়িকারা এত তাড়াতাড়ি অন্য শাড়ি পড়ে কিভাবে।

বাড়ির খুলিতেই শ্যালো মেশিন। সকালে দাঁতন খুজে দাঁত মেজে মেশিনের ড্রেনে মুখ ধুতাম। দুপুরে গা ধুতাম মেশিনের জলে। গা আঠালো হয়ে যেত। মা আবার নিয়ে যেতেন কলের পাড়ে।