ইয়াক ইয়াক

আজ বড় অলস সময় কাটছে। হাতে যে কাজ নেই তা নয়। কিন্তু স্থান, কাল ও পাত্রভেদে সব কাজ করতে হয় বলে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।

গত কয়েকদিন ধরে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা পড়ছিলাম। প্রথমবার পড়েছিলাম ক্লাস নাইনে থাকতে। অভিজিতের সুন্দর বইখানি ধার করে এনেছিলাম। আমার কাছ থেকে নিয়েছিল শাওন। তারপর তা আর মালিকের কাছে ফিরেছে কিনা কে জানে ।

কিন্ডল কেনার পর থেকেই নতুন উদ্যমে বই পড়া শুরু করলাম। প্রথমে অনেকগুলো ইংরেজি বই পড়লাম। কিন্তু বাংলা না পড়লে যে পেটের ভাত হজম হতে চায় না।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর কিছু বাংলা বই পেলাম। সাথে সেই পুরানো টেনিদা। আহ, কি সুমধুর সেই স্মৃতি। এত নির্ভেজাল জীবন আর আনন্দ আর কোথায় পাব।

ইউটিউবে দেখলাম টেনিদা কার্টুনও আছে। দেখলাম কয়েক পর্ব। একবারে খারাপ না। ভয়েস খুব ভাল লেগেছে।

Advertisements

নারিকেল পাতার ঘড়ি

আমাদের গ্রামের বাড়িতে বেশ কিছু নারিকেল গাছ আছে । আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। একবার প্রচন্ড এক তুফানে আমাদের গোয়াল ঘরের চালা উড়ে গিয়ে আটকালো বাড়ির মাঝে এক নারিকেল গাছের মাথায়।

মাঝে মাঝে নারিকেল গাছের পাতা কাটা হত। সেদিন যেন উৎসব এর আমেজ এসে যেত বাড়িতে। সবাই মিলে কাজে লেগে যেত। কেউ পাতাগুলো কান্ড থেকে আলাদা করছে, কেউ কান্ডটা কাটছে ছোট করে, আবার কেউ সেগুলো চিকন শলাকা তৈরী করছে। সেগুলো দিয়ে তৈরী হত ঝাড়ু।

আর আমরা তৈরী করতাম নারকেল পাতার বাঁশি, হাতঘড়ি ও চশমা। বাঁশিগুলো হতো চোঙ্গার মত। মেয়েরা কলার পাতা চিকন করে ছিঁড়ে তৈরী করত চুল। আমের পুরানো কোয়া দিয়েও সুন্দর বাঁশি তৈর করা যেত।

গ্রামের দিনগুলি

তখন আমি গ্রামে ছিলাম। বয়স কত মনে নেই। ৩-৪ হতে পারে। আমাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য রবিন নামে একজনকে মাসির বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। তার সাথে একদিন দহপাড়া মাছ ধরতে যাই। গিয়ে দেখি অনেক লোক মাছ ধরছে। অনেকটা বিলের মত। আমার হাতে একটা বড় মাছ এসেছিল। ধরতে পারি নি। বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। তারপরও পরে মনে হয় আর যাওয়া হয়নি।

স্কুলের দিকে যে রাস্তাটা গেছে আমাদের বাড়ি থেকে, মাঝে একটা ছোট কাল্ভার্ট পড়ে। আমরা বলতাম পুল। পুলের নিচে ডোবার মত কিছুটা জল ছিল। একদিন কাকা, স্বপন, মনোরঞ্জনের সাথে গেলাম সেখানে স্নান করতে। আমার মা জানলে রাগ করবে তাই ওরা আমাকে প্রথমে নিতে চায় নি। পরে সল্টেজ বিস্কুট ঘুষ দিতে হয়েছিল। সারা দুপুর জলে ঝাপাঝাপি করে রোদে গা-মাথা শুকিয়ে নিশ্চিন্ত মনে যখন বাড়ি ফিরলাম, আমার লাল চোখ দেখে মা বুঝে গেলেন কি করেছি সারাদিন। আবার কলের পাড়ে নিয়ে গেলেন গা ধুতে।

একদিন সকালে আমি আর মনোরঞ্জন সেই স্কুলে যাওয়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সেই পুলের কাছে এসে থামলাম। দুজনে ফন্দি করলাম, রড় হয়ে একটা ট্রাক কিনব । আমি হবো ড্রাইভার, আর ও হেল্পার। অথবা একটা টেম্পু কিনব।

মাঝে মাঝে আমরা ফুরকুনি (বনভোজন) করতাম ছোটরা মিলে। আমাদের সমবয়সী ছিল চপলা। রান্নার দায়িত্ব ছিল তার। নামায় (ধানক্ষেতে) চুলা তৈরি করতাম। সবাই একটু করে চাল, ডাল, আলু, পত্তে, পিয়েজ, বেগুন, নুন, তেল নিয়ে আসত। হলুদের কথা মনে থাকত না। বেগুন ভাঁজি হত কালো। একবার নামায় কাঁকড়া পেয়েছিলাম। সেটাই ভেঁজে খাওয়া হল। বড়দের সাথে একবার পুষনা করেছিলাম। শীতের ভিতর। মাইক ভাড়া করে আনা হয়েছিল।

গরু দিয়ে হালের পর বড় বড় মাটির ঢেলা হত। সেগুলোকে আবার ঢেল ভাঙ্গা দিয়ে ভাংতে হত। বাবু আমার জন্য একটা ছোট ঢেল ভাঙ্গা বানিয়ে দিয়েছিল। নিজের জিনিসের অনুভূতি অন্যরকম। স্যালাইনের ব্যাগ, পাইপ আর সিরিঞ্জ দিয়ে শ্যালো মেশিন বানাতাম আর স্বপ্ন দেখতাম আমার একটা ছোট মেশিন থাকবে।

কিছুদিন পর পেলাম ফুটবল। গ্রামে আমরা বলতাম বল খেলা। একটা খেলা ছিল ফাটাফাটি খেলা। বলে শট দিয়ে অন্যকে মারতে হবে। স্বপন ছিল সব থেকে পাকা। একদিন অনেক সাহস নিয়ে ওর সাথে ফাটাফাটি খেললাম।

আমাদের বাড়িতে টিভি আসার পর পুরো গ্রামের লোকজন শুক্রবারে জমা হত ছবি দেখার জন্য। আমি দুঃখের অংশ দেখতে পারতাম না। কর্তার কোলে করে ঘুরতাম। আমার আবদার রাখতে গিয়ে তার দেখা হত না। রাতে হত আলিফ লায়লা। অর্ধেক হতে ব্যাটারী শেষ হয়ে আসত। ধীরে ধীরে পর্দা ছোট হয়ে আসত। একদিন নাটকে গান হল, “আজ পাশা খেলব রে শ্যাম”। পরদিন কর্তা সারাদিন গাইলেন সে গান। আর একদিন নাটকে কে যেন কাঁদছিল। কর্তা ছুটে এলেন আমাদের ঘরে। খোঁজ নিলেন মা কাঁদছেন কি না। কতদিন আমি আর কাকারা গবেষণা করেছি টিভি বন্ধ হলে ছোট মানুষ গুলো কই যায়। নায়িকারা এত তাড়াতাড়ি অন্য শাড়ি পড়ে কিভাবে।

বাড়ির খুলিতেই শ্যালো মেশিন। সকালে দাঁতন খুজে দাঁত মেজে মেশিনের ড্রেনে মুখ ধুতাম। দুপুরে গা ধুতাম মেশিনের জলে। গা আঠালো হয়ে যেত। মা আবার নিয়ে যেতেন কলের পাড়ে।

দিন বদলের গান

img_20161011_120500743

আমার এক মাসতুতো ভাই দর্শন। আমার কাছাকাছি বয়সের। ওর সাথে খুব ছোটবেলায় আমার মিল ছিল। আমরা তখন গ্রামে থাকতাম। ওরা বেড়াতে এসেছিল আমাদের বাড়িতে। আমার কালো এক জোড়া বুট জুতা ছিল। সেই জুতো জোড়া বদল করেছিলাম দর্শনের জুতার সাথে।

আরেকবার দেখা হয়েছিল বোধহয় বড় মাসির বাড়িতে। ক্রিকেট খেলেছিলাম একসাথে। এর বেশি কিছু মনে নেই।

আর একবার ওর ছোট ভাই এর অন্নপ্রাশনে।

এরপর ওরা ভারত চলে যায়। আর দেখা হয় নি। ওর ভাই-বোনদের সাথে দেখা হয়েছে, কিন্তু ওর সাথে হয় নি।

আজ প্রায় ২০ বছর পর ফেসবুকে খুঁজে পেলাম। রিকুয়েস্ট একসেপ্ট হল। খুঁজে খুঁজে অনেক ছবি দেখলাম। চেহারা সেই আগের মতই আছে। ও বিয়ে করেছে। বাবা হয়েছে। চাকুরী করছে। অন্যরকম অনুভূতি।

এভাবেই আজো অনেক কেই খুঁজে চলেছি। অনেকের সন্ধান পেয়েছি, অনেকের সন্ধান পাব আর কারো হয়তো পাব না।

দাদা দিদির কথা ও তাম্বুলপুর

গত ২৪ জুন রাতে বড়মাসি মারা গেছেন। পরদিন সকালে মা ফোন করে জানাল। বড়ই ভেঙ্গে পড়েছেন।

বড়মাসিদের সাথে আমাদের বিশেষ করে আমার সম্পর্কটা অন্যরকম। কেননা আমার অনেকটা শৈশব কেটেছে মাসতুতো ভাই বোনদের সাথে।

১৯৯৬ সালে লতা ও ঊষা দিদির এস,এস,সি পরীক্ষা। বড় মেসো তখন রাজাবিরাট এর তহশিলদার। তিনি নিজের কাছে রেখে মেয়েদের পড়াতেন। তাদের পরীক্ষার সিট পড়ে মফঃস্বলে। সেখানে আমাদের জমি কেনা ছিল আর তাতে দুটো টিনের ঘর। তো সেখানেই তারা উঠলেন। আমাকেও গ্রামের বাড়ি থেকে পাঠানো হল।
তাদের পরীক্ষার সময়টা বসেই ছিলাম। তারপর হঠাৎ করেই একদিন কেজি স্কুলে নিয়ে ভর্তি করানো হল।

সেই থেকেই শুরু। দিদিরা পাস করল। কলেজে ভর্তি হল। শিল্পী দিদিও এসে কিছুদিন থাকল। শিখা দিদি ও উৎপল দাদা এল। তারা এস,এস,সি পাস করল। কলেজে ভর্তি হল।

মাঝে আমরা বাড়ি করলাম। তখন সবাই পাশের বাসায় ভাড়া থাকতাম।

সেই সূত্রেই মাসীদের বাড়িতে যাওয়া হত বেশী।

সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে ঊষা দিদির বিয়ের কথা। তখন আমি বোধহয় থ্রি তে পড়ি। খুব আনন্দ হয়েছিল সেবার। আমার মায়েরা ৬ বোন, এক ভাই। তাই মাসতুতো আর মামাত ভাইবোন মিলে আমরা অনেক। সেবার বোধহয় বেশির ভাগ ভাইবোন এসেছিল।

আরেকবার গিয়েছিলাম স্বরসতী পূজার সময়। সেবারও অনেক মজা হয়েছিল। ওখানকার স্থানীয় ছেলেদের সাথে অনেক মিল হয়ে গিয়েছিল। সবাই মিলে ক্রিকেট খেলতাম।

শেষবার গেলাম প্রদীপ দাদার বিয়েতে। তখন ক্লাস এইটে পড়ি।

আপামণি লবণটা যেন কি

আগে এখনকার মত আয়োডিন লবনের প্রচলন ছিল না। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই খোলা লবন ব্যাবহার করত। আমাদের গ্রামে ভ্যানে করে নিয়ে আসত লবন। ভ্যানের সামনে থাকত একটা মাইক। তাতে ঘোষণা দিত, “এই লবন বদল”। মানে হল, বিভিন্ন পুরানো জিনিসপত্রের পরিবর্তে লবন বদল করে নেয়া।

[তখন বিটিভিতে আয়োডিনযুক্ত লবনের অভাবে কি কি রোগ হয়, তা নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হত। এর মাঝে একটি রোগ ছিল ঘ্যাগ। আমাদের পাশের বাড়িতে মনোরঞ্জনের ঠাকুরমা থাকত। তার ঘ্যাগ থাকায় অনেকে তাকে ঘ্যাগী বুড়ি বলে ডাকত। আবার গুরুজনেরা বলত বোতলে জল খেলেও এরকম ঘ্যাগ হয়। তাই আমরা ভয়ে আয়োডিনযুক্ত লবন খেতাম আর বোতলে জল খাওয়া থেকে বিরত ছিলাম।

তখন মোল্লা সল্টের খুব নাম ডাক।

“তেজ পাতা, চিনি,
বাইছা বাইছা কিনি,
কেনে প্রতিজন
মোল্লা লবণ।।”]

এরকম আরো ছিল। মাঝে মাঝে কটকটিওয়ালা আসত। এই কটকটি অবশ্য মহাস্থানগড়ের কটকটি নয়। তারা নিত লোহার জিনিসপত্র।

আইস্ক্রিমওয়ালা ছিল দুই রকমের। একদল ছিল কাঠের বাক্স নিয়ে ঘুরত সাইকেলের পিছনে। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে কাঠের বাক্সের ঢাকনা খুলে জোরে আওয়াজ করে বন্ধ করত। তাতেই বাড়ির যত ছেলে-মেয়ে ছুটে আসত আলু বা ধান নিয়ে। টাকা দিয়ে বেচা-কেনা খুব একটা হত না। আর টাকা ছিলই বা কার কাছে! আর এক ধরনের আইস্ক্রিমওয়াল আসত ভ্যান নিয়ে ঘন্টা বাজাতে বাজাতে। তবে গ্রামের দিকে তাদের দেখা পাওয়া যেত না।

রান্নার হাঁড়িপাতিল নিয়ে আসত আরেক দল ফেরিওয়ালা। তাদের বিনিময় ছিল পুরানো কাপড়।

আর ছিল মেয়েদের বিভিন্ন সাজগোজের ফেরিওয়ালা। তাদের ছিল সুন্দর চারকোনা কাঠের বাক্স। সামনের দিকটা কাঁচের। তাতে সুন্দরভাবে সস্তা দুল, নোলক, গলার চেইন সাজানো থাকত। সবচেয়ে প্রচলিত ছিল তিব্বত স্নো আর শীতকালে পমেড।

নয়ন ভরা জল

আজ মনটা হঠাত বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল।
আমি পড়াশোনা করেছি মফস্বলের স্কুলে। তাই আমার বন্ধুমহল ছিল বিচিত্র।
সেভেনে থাকতে নয়ন নামের এক জনের সাথে বেশ খাতির হয়। সাইজে সে আমার দেড় গুন। আমাকে কেন পছন্দ করত জানি না। তার সব গোপন কথা আমার কাছে বলত।
ঠিকমত স্কুলে আসা বা পড়াশোনা কোনোটাই তার হয়ে ওঠেনি। কোনমতে এসএসসি পাস করে দোকান করত। আর স্কুলের পর থেকেই আমি বাইরে। তাই যোগাযোগ  ছিল না বললেই চলে।
কিছুদিন আগে সে আমাকে ফেসবুকে রিকুয়েস্ট পাঠায়। আমি এড করি। ইনবক্সে জানায় সে জীবিকার তাগিদে লিবিয়া গেছে। ছবি পাঠায়। সেখানে তার ভাল লাগে না। আমাদের কথা অনেক মনে পড়ে।
তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। আজ সে ফেসবুক মেসেঞ্জার এ কল দিয়েছে। অফিসে থাকায় ধরতে পারিনি।একটু পর তার ভয়েস মেসেজ।  সেই চিরচেনা কণ্ঠ। শুধু একরাশ বেদনায় ভরা।