ঘুরে এলাম কুয়াকাটা থেকে – ২

আগের দিনই ঠিক করা ছিল সূর্যোদয় দেখতে হেঁটে যাব। এ কারণে ভোর চারটায় সবাই ঘুম থেকে উঠলাম (কেউ কেউ উঠতে না চাইলেও জোরপূর্বক ডেকে তোলা হল)। বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। বাইরে তখনও অন্ধকার। বেশ ঠান্ডাও পড়েছিল।

যাই হোক, সবাই হাঁটা শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মাঝেই টের পেলাম যতটা কাছে ভেবেছিলাম ততটা কাছে নয়। ডান পাশে সাগরের গর্জন, বামে ঝাউবন, আশেপাশে জনমানব নেই। বেশ একটা গা ছমছমে ভাব। সবাই চেষ্টা করছিলাম কাছাকাছি থাকার পর। তারপরও দুই একজন পিছিয়ে পড়ছে, আবার দুই একজন সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। বারবার সবাইকে সাবধান করে দেয়া হচ্ছে। একে তো অচেনা জায়গা, তার উপর জনমানবহীন। পুরো ব্যাপারটা বেশ রোমাঞ্চকর।

এদিকে হাঁটছি তো হাঁটছি, পথের তো শেষ হয় না। বেশ খানিক পর (৩০-৩৫ মিনিট) প্রথম একটি বাইক দেখতে পেলাম। একটু সাহস ও উৎসাহ পেলাম। যাক, ঠিক পথেই চলেছি। তারপরও পথ শেষ হয় না। একে একে বাইক যায়, আসে আর আমাদের বলে, “মামা, হেঁটে যেতে পারবেন না, এখনো অনেক দূর।”

অবশেষে ৬ টা বাজার মিনিট ১০ আগে আমরা গন্তব্যে পৌঁছলাম। অনেক লোক এর মাঝেই বাইকে করে এসে গেছে। এবার সূয্যি মামার জন্য অপেক্ষার পালা। না, মামার দেখা নেই। সাথে আনা বিস্কুটগুলো ততক্ষণে শেষ।

হঠাৎ পুব দিগন্তে লাল থালার মত একটা কিছু দেখা গেল। আর সাথে সাথে জনতার হাত তালি। চমৎকার মুহুর্তু। যদিও সাগর থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে । সাথে সাথে জনতার ক্যামেরা চলতে লাগল। বিভিন্ন ঢঙে তোলা হল নানা ছবি(আমিও তুলেছি)।  সেই সাথে সাগরের পানিতে খানিক নাচন-কুদন করলাম।

সূর্যোদয় - কুয়াকাটা
সূর্যোদয় – কুয়াকাটা

ঘন্টা খানেকের মাঝে সূর্যের ভোল্ট যখন ১০০ এর বেশি হতে চলল, তখন বুঝলাম এবার ফেরার পালা।

ফেরার সময় আবার সেই হন্টন। কয়েকজন অবশ্য বাইকে করে ফিরে গেল। আমিও দো-টানায় ছিলাম। পরে ঠিক করলাম, না হেঁটেই যাব। চলে এলাম।

নাস্তা সেরে হোটেলে এসে আরেক দফা বিশ্রাম নিলাম। ১২ টার মাঝে হোটেল ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের ফেরার বাস সাড়ে ৫ টায়। মানে এতটা সময় বাইরে কাটাতে হবে।

আমরা হোটেল ম্যানেজারকে বলে একটা রুমে সব ব্যাগ রাখার ব্যবস্থা করে ১২ টার দিকে বের হলাম। একটু এদিক সেদিক করে দুপুরের খাবার খেতে গেলাম। ইলিশ মাছ, আলু ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা দিয়ে বেশ খাওয়া হল। এখন একটা বসার জায়গা খুঁজতে হবে।

বেশ খানিক খোঁজার পর নীলাঞ্জন একটা সুন্দর জায়গা বের করল সাগরের তীর ঘেঁষে। এখানে ঘন্টা কয়েক কেটে গেল গল্পে, আড্ডা আর তাস পিটিয়ে। মাঝখানে জাহিদ গিয়ে শুঁটকি কিনে আনল।

একটু পরেই বিকেল হয়ে গেল। আমরা কুয়াকাটার আরেক আকর্ষন সূর্যাস্ত দেখার জন্য রওনা হলাম।

আগের দিন একটুর জন্য মিস করেছি। তাই আগেভাগেই চলে এলাম। এখানে পড়ন্ত বিকেলটা একদম অন্যরকম, অসাধারণ।

যাই হোক, এবার আর মামা ডুবছে না। অনেকক্ষণ ফটোগ্রাফী চললন।শেষ পর্যন্ত মামা অস্ত গেলেন আর আমরা বি, আর, টি, সি কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম।

সূর্যাস্ত - কুয়াকাটা
সূর্যাস্ত – কুয়াকাটা

ঘুরে এলাম কুয়াকাটা থেকে -১

এবারের ট্যুর’টা একরকম হঠাৎ করেই হয়ে গেল। সুদীপ্তদের অ্যাটাসমেন্ট ক্যান্সেল হয়ে গেল আর আমারও তেমন কোন প্লান ছিল না। তাই ওরা এসে যখন আমন্ত্রণ জানালো, এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। মনের মাঝে সবসময়ই ঘোরা-ফেরার ইচ্ছা থাকলেও হয়ে ওঠে না। এবার আর মিস করতে চাই না।

তো ২৩ তারিখ রাতে বি, আর, টি, সি এর “স্পেশাল” বাসে করে আমরা দশজন রওনা দিলাম । রাস্তাটা খুলনা থেকে পিরোজপুর হয়ে বরগুনা, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং কুয়াকাটা। মাঝখানে মাত্র পাঁচটা ফেরি পার করতে হয়। ঢাকা-খুলনা রুটে বাস ফেরির জন্য অপেক্ষা করে, আর এখানে তার বিপরীত। রাস্তাগুলো বেশ সরু হলেও গাড়ি শুন্যের কাছাকাছি থাকায় ওয়ান ওয়ে রোডের মত লাগে অনেকটা।

৫ টা ফেরি ঘাটের মাঝে শুধু একটার নাম খেয়াল করতে পেরেছি। পিরোজপুরে কীর্তখোলা নদীতে কুমির মারা ঘাট। এই নদী টা তুলনামূলকভাবে বড়। বাকি ঘাটগুলোর নাম ঘুমের কারণে মিস হয়ে গেছে। শেষ ৩ টা কুয়াকাটার কাছাকাছি, এর ২ টা তে ব্রিজ হচ্ছে।

যাই হোক, সকাল ৬ টায় আমরা কুয়াকাটায় পৌছলাম এবং আধা ঘন্টা খানেক ঘোরাঘুরি করে একটা হোটেলে ২ টা রুম ভাড়া করে নাস্তা করতে বের হলাম। নাস্তা শেষে ঠিক করা হল ঘুরতে বের হব। এখানে ঘোরা-ঘুরির জন্য মোটর-সাইকেল খুব প্রচলিত। আমরাও ১০ জনের জন্য ৫ টা বাইক ভাড়া করলাম।

জায়গাগুলোর নাম সব মনে নেই। তবে আমরা সাগর তীর দিয়ে ঝাউবন হয়ে লাল কাঁকড়ার চর পর্যন্ত টানা গিয়েছি। মাঝে যেখান থেকে সূর্যোদয় দেখা হয়, সেই জায়গা দেখলাম।

লাল কাঁকড়ার চর দেখে আমরা গেলাম মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার দেখতে। এই বিহারের একটি নিজস্ব স্কুল আছে, যেখানে ফ্রিতে লেখাপড়া শেখানো হয়। দেখে বেশ ভাল লাগল। পাশেই রাখাইন পল্লী। আমরা একটি বাড়িতে ঢুকে তাদের বাড়িগুলো দেখলাম। তাদের মধ্যে কয়েকজন তখন বসে হাতে বিভিন্ন ধরনের কাপড় তৈরী করছিলেন। ওদের বাড়িগুলো একটু আলাদা। দ্বি-তল বাড়ি, নিচের তলা-টা ফাঁকা। সেখানেই কাপড় তৈরীর কাজ চলে।

এরপর এদিকটা দেখা শেষ। ফেরার পথে রাখাইন মার্কেটে নামলাম, যদিও বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ ছিল। পাশেই একটি বৌদ্ধ মন্দির, বেশ সুন্দর। সেখানে কিছু সময় কাটালাম।

দুপুরে কোথায় খাওয়া হবে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছিল। সিদ্ধান্ত হল ফাতরার বনের পাশে খাবার দোকান আছে, সেখানে নাকি টাটকা মাছ ভাঁজি পাওয়া যায়। তো বাইকওয়ালাদের আর কিছু বেশি টাকা দিয়ে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল।

গিয়ে দেখলাম কয়েকটি বাক্সে ইলিশ, কাঁকড়া, চিংড়ি, রূপচাঁদা আর একটা মাছ (নাম মনে নাই) রাখা আছে। আমরা একটা ইলিশ, রূপচাঁদা আর সেই নাম না জানা মাছের অর্ডার দিলাম। সাথে জানলাম শুধু মাছ খেতে হবে, ভাতের কোন আশা নেই। এমনেতেই, পেট জ্বালা করছিল, এবার হাহাকার করে উঠল।

এর মাঝে কয়েকজন কাপড়-চোপড় নিয়ে এসেছিল সাগরে ডুব দিতে। কিন্তু পানির অবস্থা ঠিক সুবিধার লাগল না। শুধু নীলি একটু চেষ্টা করে দেখল।

আধা ঘন্টাখানেক পর আমাদের খাবার তৈরী হয়ে গেল। আমরা সবাই মিলে ভাগ করে খেলাম।

তারপর সবাই হোটেলে ফিরে এসে স্নান করে লম্বা ঘুম দিলাম। কারণ বিকেলে সূর্যাস্ত দেখতে যাব।

বিকেলে নাস্তা করার পর আমরা সাগর তীরের দিকে হাঁটা দিলাম। তীরে এসে মন ভেঙ্গে গেল। সূর্য ডুব দিয়েছে। কালকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যাই হোক সবাই মিলে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম, সন্ধ্যা পেরিয়ে গেল। সন্ধার পর সাগর আলাদা রূপ ধারণ করে। অসাধারণ সেই রূপ।

আটটা পর্যন্ত থেকে সেদিনের মত ফিরে এলাম। খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম।

তাড়াতাড়ি ঘুমাতে হবে। কাল সকালে সূর্যোদয় দেখব। প্রায় আট কিলোমিটার। ঠিক করেছি হেঁটেই যাব।

নতুন চোঁখে উত্তরবঙ্গের রূপ

এই বছরের শুরুতে দেড় মাসের এক বিশাল ছুটি পাই। প্রথম কিছুদিন বাড়িতে শুয়ে বসে কাটালাম। সরস্বতী পূজার দিনও এগিয়ে আসছিল। মা বলল, “চল এবার তোর ছোট মাসির বাড়িতে পুজা করবি”। তো আরকি পুজার আগের দিন মা’র সাথে চললাম রংপুরের কাউনিয়ার উদ্দ্যেশে। উত্তরবঙ্গে বাড়ি কিন্তু তেমনভাবে চেনা হয়নি। দেখি এবার কেমন সুযোগ মেলে।

জানুয়ারী মাসে বাংলাদেশে এমনিতেই তীব্র শীত থাকে; রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরের জেলাগুলোতে অবস্থা আরও ভয়াবহ। কাউনিয়াতেও তার ব্যতিক্রম হবে না, জানাই ছিল; তবু এতটা শীত আশা করিনি। ভোরবেলাতে তো ডাবল লেপেও কাজ চলে না। আমি ডাবল লেপ এর কথা বলছি কিন্তু এই এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী একটা পাতলা কম্বলের জন্য হাহাকার করে। এজন্য মাঝে মাঝে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

কাউনিয়াতে আসার আরেকটি কারণ হল তিস্তা রেলসেতুটি ভালভাবে দেখা এবং নির্মিতব্য তিস্তা সড়কসেতুটি দেখা। কাউনিয়া বাজার থেকে অটোতে মাত্র ১৫ মিনিটের রাস্তা।একদিন বিকেলে সবাইমিলে গেলাম সেখানে। আমার মাস্‌তুতো ভাইটি (ক্লাস সেভেনে পড়ে) পুরাই পাংখা। আমার গাইড হিসেবে কাজ করল।

This slideshow requires JavaScript.

এখানকার রেলসেতুটি আসলে একটু অন্যরকম। এটি দিয়ে সাধারণ যানবাহন, রিক্সা-ভ্যান, এমনকি মানুষও যাতায়াত করে। তবে রাস্তাটি এক দিকে। ১৫ মিনিট পরপর দিক পরিবর্তন হয়। শুধু রেল আসলে যান চলাচল বন্ধ থাকে।আর ১-২ বছর পর হয়ত এই দৃশ্যটি দেখা যাবে না। কারণ পাশেই তৈরী হচ্ছে সড়ক সেতু। কাজও প্রায় শেষের দিকে।

ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞান বইয়ে পড়েছিলাম কাউনিয়া রেলওয়ে জংশনের কথা। ভেবেছিলাম বড় কোন জংশন হবে! কিন্তু না সেরকম কিছু দেখলাম না। তবে জংশনে গিয়ে এক পথগায়কের গান শুনলাম… অসাধারণ।