আপামণি লবণটা যেন কি

আগে এখনকার মত আয়োডিন লবনের প্রচলন ছিল না। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই খোলা লবন ব্যাবহার করত। আমাদের গ্রামে ভ্যানে করে নিয়ে আসত লবন। ভ্যানের সামনে থাকত একটা মাইক। তাতে ঘোষণা দিত, “এই লবন বদল”। মানে হল, বিভিন্ন পুরানো জিনিসপত্রের পরিবর্তে লবন বদল করে নেয়া।

[তখন বিটিভিতে আয়োডিনযুক্ত লবনের অভাবে কি কি রোগ হয়, তা নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হত। এর মাঝে একটি রোগ ছিল ঘ্যাগ। আমাদের পাশের বাড়িতে মনোরঞ্জনের ঠাকুরমা থাকত। তার ঘ্যাগ থাকায় অনেকে তাকে ঘ্যাগী বুড়ি বলে ডাকত। আবার গুরুজনেরা বলত বোতলে জল খেলেও এরকম ঘ্যাগ হয়। তাই আমরা ভয়ে আয়োডিনযুক্ত লবন খেতাম আর বোতলে জল খাওয়া থেকে বিরত ছিলাম।

তখন মোল্লা সল্টের খুব নাম ডাক।

“তেজ পাতা, চিনি,
বাইছা বাইছা কিনি,
কেনে প্রতিজন
মোল্লা লবণ।।”]

এরকম আরো ছিল। মাঝে মাঝে কটকটিওয়ালা আসত। এই কটকটি অবশ্য মহাস্থানগড়ের কটকটি নয়। তারা নিত লোহার জিনিসপত্র।

আইস্ক্রিমওয়ালা ছিল দুই রকমের। একদল ছিল কাঠের বাক্স নিয়ে ঘুরত সাইকেলের পিছনে। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে কাঠের বাক্সের ঢাকনা খুলে জোরে আওয়াজ করে বন্ধ করত। তাতেই বাড়ির যত ছেলে-মেয়ে ছুটে আসত আলু বা ধান নিয়ে। টাকা দিয়ে বেচা-কেনা খুব একটা হত না। আর টাকা ছিলই বা কার কাছে! আর এক ধরনের আইস্ক্রিমওয়াল আসত ভ্যান নিয়ে ঘন্টা বাজাতে বাজাতে। তবে গ্রামের দিকে তাদের দেখা পাওয়া যেত না।

রান্নার হাঁড়িপাতিল নিয়ে আসত আরেক দল ফেরিওয়ালা। তাদের বিনিময় ছিল পুরানো কাপড়।

আর ছিল মেয়েদের বিভিন্ন সাজগোজের ফেরিওয়ালা। তাদের ছিল সুন্দর চারকোনা কাঠের বাক্স। সামনের দিকটা কাঁচের। তাতে সুন্দরভাবে সস্তা দুল, নোলক, গলার চেইন সাজানো থাকত। সবচেয়ে প্রচলিত ছিল তিব্বত স্নো আর শীতকালে পমেড।

ছবি

নয়ন ভরা জল

আজ মনটা হঠাত বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল।
আমি পড়াশোনা করেছি মফস্বলের স্কুলে। তাই আমার বন্ধুমহল ছিল বিচিত্র।
সেভেনে থাকতে নয়ন নামের এক জনের সাথে বেশ খাতির হয়। সাইজে সে আমার দেড় গুন। আমাকে কেন পছন্দ করত জানি না। তার সব গোপন কথা আমার কাছে বলত।
ঠিকমত স্কুলে আসা বা পড়াশোনা কোনোটাই তার হয়ে ওঠেনি। কোনমতে এসএসসি পাস করে দোকান করত। আর স্কুলের পর থেকেই আমি বাইরে। তাই যোগাযোগ  ছিল না বললেই চলে।
কিছুদিন আগে সে আমাকে ফেসবুকে রিকুয়েস্ট পাঠায়। আমি এড করি। ইনবক্সে জানায় সে জীবিকার তাগিদে লিবিয়া গেছে। ছবি পাঠায়। সেখানে তার ভাল লাগে না। আমাদের কথা অনেক মনে পড়ে।
তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। আজ সে ফেসবুক মেসেঞ্জার এ কল দিয়েছে। অফিসে থাকায় ধরতে পারিনি।একটু পর তার ভয়েস মেসেজ।  সেই চিরচেনা কণ্ঠ। শুধু একরাশ বেদনায় ভরা।

বাবুর ঝলো মাসী

বাবুর ঝলো মাসী হল আমার ঠাকুরমার বোন।

তার এক নাতনী হল ইতি দি। অনেক ছোট থাকতে একবার ইতি দিদিদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন মনে হয় কোন একটা মেলা চলছিল। আমাকে একটা মাটির নৌকা কিনে দিয়েছিল যা কিনা দিদিদের বাড়িতেই ভেঙ্গে ফেলেছিলাম।

চিত্র কাকা মনে হয় ভোকেশনালে পড়তেন। একবার তার সাথে তার কলেজে গিয়েছিলাম।

চিত্র কাকার বাবা হুঁকা টানতেন । অস্থির জিনিস। আমার জীবনে যে দু-একজনকে হুঁকা টানতে দেখেছি তার মাঝে তিনি একজন। তিনি মারা যাওয়ার পর শ্রাদ্ধের সময় গিয়েছিলাম । সেসময় ইলিশ রান্না হয়েছিল। কেন জানি সেদিন খাইনি। অনেক কান্নাকাটি ও ঝামেলা করেছিলাম। পরে মেজদাদুর গাড়িতে করে বাজারে গিয়ে খানা-দানা করে এসেছিলাম।

একবার শেফালী পিসিদের বাড়ি গিয়েছিলাম ঠাকুরমার সাথে। যতদিন ছিলাম, ভালই ছিলাম। আসার দিন বাঁধল ঝামেলা। পিসির সাথে কি নিয়ে যেন ঝগড়া হয়ে গেল।

তারপর নীলি পিসির মেয়ের অন্নপ্রাশনেও তো গেলাম ব্যবিটাক্সি চেপে।

এই পরিবার নিয়ে এত লেখা কারন ইতি দিদি আর নীলি পিসিরা ভারতবাসী হয়েছেন। তাদের সাথে কবে দেখা হবে কে জানে।

চিত্র কাকা আছেন। যে কাউকে বিপদে আপদে সাহায্য করার জন্য আছেন।

কোন এক ক্লান্ত সন্ধ্যায়

কেমন ছিল সেই বৃষ্টিতে কাকভেজা সন্ধ্যার গল্প? মনে কি আছে তোমার? আমার তো বেশ মনে আছে।

পাওয়া না পাওয়ার অঙ্ক ভুলে গিয়ে, হাতের ছাতাটা বন্ধ করে, আগামীকালের জ্বরের চিন্তা না করে অথবা দামী বাটা সু কে তুচ্ছ মনে করে এক ঝড়ো সন্ধ্যায় মালিবাগের রাস্তার হেটেছিলাম সদ্য স্বাধীন কোন দেশের মানুষের মত।

পৃথিবীকে পায়ের নীচে রেখে, সমস্ত চিন্তা-ভাবনাকে বাক্স-বন্দী করে সেদিন  রিক্সায় বসে কাকভেজা হয়েছিলাম।

চুপসে যাওয়া দাপ্তরিক জামার নীচে উষ্ণ দেহ শীত অনুভব করলে দু-হাত খুলে আলিঙ্গন করেছি সদ্য পবিত্র হয়ে যাওয়া এ ধরনীর স্নিগ্ধ বাতাসকে।

এখনো বেশ লাগে সেই সন্ধ্যাটুকু!